

‘মাদকের বিরুদ্ধে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম’, ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা’ সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে গত সোমবার দুই থানার ওসি’র এমন কঠোর বক্তব্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মাদক নির্মূলের বিষয়টি। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, বক্তব্যের পর বাস্তবে কতটা বদলাবে মাদকের চিত্র? বাহক কিংবা খুচরা কারবারি নয়, ইয়াবার নেপথ্যের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কবে দৃশ্যমান অভিযান হবে। উখিয়া থানার ওসি মো. আতিকুর রহমান মাদকবিরোধী অবস্থান ঘোষণা করে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়ার কথা জানান। একই সময়ে টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম মাদকসেবী, কারবারি ও গডফাদারদের তথ্য পুলিশকে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে। তার ভাষায়, আপনাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা টেকনাফে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো। দুই থানার ওসি’র এমন বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তবে তাদের মতে, সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ বন্ধ, পরিবহন নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া এবং বড় কারবারিদের আইনের আওতায় আনতে হলে শুধু সচেতনতামূলক কর্মসূচি কিংবা বক্তব্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক, দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ অভিযান। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধরা পড়ছে উখিয়া-টেকনাফের ইয়াবা মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা উখিয়া-টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা পাচারের অন্যতম আলোচিত রুট। সীমান্ত ও সাগরপথে ইয়াবার চালান প্রবেশের অভিযোগের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উখিয়া-টেকনাফ থেকে যাওয়া ইয়াবার চালান ধরা পড়ার ঘটনাও নিয়মিত সামনে আসছে। সাম্প্রতিক সময়েও বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব ঘটনায় অধিকাংশ সময় বাহক বা পরিবহনকারীরা গ্রেপ্তার হলেও বড় চালানের নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের কতজনকে আইনের আওতায় আনা গেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাতারাতি বদলে যাচ্ছে জীবনযাত্রা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে কিছু তরুণের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। কেউ ছোট ব্যবসা বা পান দোকান থেকে শুরু করে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। কারও রয়েছে একাধিক নোয়াহ্, প্রাইভেটকার কিংবা দামি মোটরসাইকেল।
তবে এসব সম্পদের সঙ্গে মাদক ব্যবসার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কাউকে মাদক কারবারি হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। স্থানীয়দের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করে এসব অস্বাভাবিক সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখলে মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। প্রশ্ন গডফাদারদের নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান হলে অনেক সময় বাহক, খুচরা বিক্রেতা কিংবা চালান পরিবহনে যুক্ত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হন। কিন্তু অর্থের জোগানদাতা, বড় চালানের নিয়ন্ত্রক ও নেপথ্যের কারবারিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা কম। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকৃত গডফাদাররা কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরের বাইরে, নাকি তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ ও অভিযান হচ্ছে না। অবশ্য টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেছেন, মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, চিহ্নিত কয়েকজন গডফাদারকে আটকও করা হয়েছে। বক্তব্যের পর এখন অপেক্ষা অভিযানের উখিয়া-টেকনাফের মানুষ এখন দুই ওসি’র বক্তব্যের বাস্তব প্রয়োগ দেখতে চান। সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ ঠেকানো, মাদক পরিবহনের রুট চিহ্নিত করা, বড় কারবারিদের গ্রেপ্তার, অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়ার দাবি স্থানীয়দের। সচেতন মহলের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের হুংকার তখনই কার্যকর বার্তা হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন তার প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যাবে। বাহক নয়, নেপথ্যের হোতাদের গ্রেপ্তার এবং মাদকের অর্থের উৎস বন্ধ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উখিয়া-টেকনাফের মানুষের প্রত্যাশা, বক্তব্য আর হুংকারে সীমাবদ্ধ না থেকে মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হোক দৃশ্যমান, ধারাবাহিক ও কার্যকর অভিযান।

পাঠকের মতামত